প্রেমিক – প্রেমিকার মৃত্যু – শার্ল বোদলেয়ার ;অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু

কবরের মতো গভীর ডিভানে লুটিয়ে
মৃদু বাসে ভরা রবে আমাদের শয্যা,
সুন্দরতর দুর আকাশেরে ফুটিয়ে
দেয়ালের তাকে অদ্ভুত ফুলসজ্জা ।
যুগল হৃদয়, চরম দহনে গলিত,
বিশাল যুগল- মশালের উল্লাসে
হবে মুখোমুখি – দর্পনে প্রতিফলিত
যুগ্ম প্রানের ভাস্বর উদ্ভাসে ।
গোলাপি এবং মায়াবী নীলের সৃষ্টি
এক সন্ধ্যায় মিলবে দুয়ের দৃষ্টি,
যেন বিদায়ের দীর্ণ দীর্ঘশ্বাস ;
পরে, দ্বার খুলে, মলিন মুকুরে রাঙাবে
এক দেবদূত, সুখী ও সবিশ্বাস ;
আমাদের মৃত আগুনের ঘুম ভাঙাবে ।
[প্রেমিক – প্রেমিকার মৃত্যু ( La Mort des Amants)
শার্ল বোদলেয়ার : তার কবিতা ; মৃত্যু ( La Mort ) অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু ]

Advertisements

বিষাদগীতিকা ২ – শার্ল বোদলেয়ার ; অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু

জানি, তোমার হৃদয় শুধু উগরে তোলে
জীর্ণ প্রেম, পরিত্যাগে পচে- ওঠা,
আজ ও সেথায় কামারশালের চুল্লি জ্বলে,
এবং রয় লুকিয়ে তোমার বুকের তলে
মহাপাপীর অহমিকার ছিটেফোটা ।
কিন্তু, শোনো, স্বপ্নে তোমার যতক্ষণে
না দেয় ধরা বিকট আভা নরকের,
এবং ডুবে অন্তহীন দু:স্বপনে
না চাও বিষ, তীক্ষ্ণ ফলা মনে- মনে
বারুদ, ছোরা, কিংবা ছোয়া মড়কের,
না পাও ভয় দরজাটুকু খুলতে হলে,
কারো নিখিল অমঙ্গলের পাঠোদ্ধার,
কেপে ওঠো, ঘন্টা পাছে বাজে বলে –
জানলে না, কোন অপ্রতিরোধ অন্ধ বলে
আকড়ে ধরে কঠিন মুঠি বিতৃষ্ণার ;
রানী, দাসী, সভয় তোমার ভালোবাসায়
তা না হলে ফুটবে না এই উচ্চারণ
অস্বাস্থ্যকর আতঙ্কিত কালো নিশায়
আমার প্রতি পূর্ণ প্রানের বিবমিষায় –
‘রাজা ! আমি তোমার সমকক্ষ এখন !’

[ বিষাদগীতিকা ২ ( Madrigal triste)
শার্ল বোদলেয়ার : তার কবিতা ; আরোকবিতা ( Poemes ajoutes ) অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু ]

বিষাদগীতিকা ১ – শার্ল বোদলেয়ার ; অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু

কী এসে যায়, থাকলে তোমার সুমতি ?
হও রূপসী, বিষাদময়ী ! অশ্রুজল
নতুন রূপে করে তোমায় শ্রীমতী,
বনের বুকে ঝর্নাধারা যেমতি,
কিংবা ঝড়ে সঞ্জীবিত ফুলের দল ।
পরম ভালোবাসি, যখন আনন্দ
তোমার নত ললাট থেকে গেছে সরে ;
হৃদয় জুড়ে সংক্রমিত আতঙ্ক,
এবং তোমার বর্তমানে, কবন্ধ
গত কালের করাল ছায়া ছড়িয়ে পড়ে ।
ভালোবাসি, আয়ত ঐ চক্ষু যখন
তপ্ত যেন রক্ত ঢালে জলের ফোটায়,
ব্যর্থ করে আমার হাতের সাধ্যসাধন
অতি পৃথুল দু:খ তোমার ছেঁড়ে বাঁধন –
নাভিশ্বাসের শব্দে যেন মৃত্যু রটায় ।
নিশ্বাসে নিই – স্বর্গসুখের পরিমেলে –
এ কি গভীর স্তোত্র, মধুর আরাধনা !–
কান্না যত ওঠে তোমার বক্ষ ঠেলে ;
ভাবি, তোমার হৃদয়তল দেয় কি জ্বেলে
নয়ন দুটি ঝরায় যত মুক্তোকণা ?

[ বিষাদগীতিকা ১ ( Madrigal triste)
শার্ল বোদলেয়ার : তার কবিতা ; আরোকবিতা ( Poemes ajoutes ) অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু ]

প্যাঁচারা – শার্ল বোদলেয়ার ; অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু

ইউ গাছের কালো ছায়ার খাপে
কোন বিদেশের দেবতা, প্যাচার দল,
ঘুরিয়ে লাল চক্ষু অবিরল
ফুলকি ছড়ায় । তারা কেবল ভাবে ।
নিথর তারা অসাড় হয়ে কাটায়,
যতক্ষণে বিষণ্ণ সেই যাম
হারিয়ে দিয়ে রবির সংগ্রাম
অন্ধকারের রাজত্ব না রটায় ।
জ্ঞানীর চোখ, তা দেখে যায় খুলে,
হাতের কাছে যা আছে নেয় তুলে,
থামায় গতি, অবুঝ আন্দোলন ;
হায় মানুষ, ছায়ার মোহে পাগল,
শাস্তি তার এ-ই তো চিরন্তন –
কেবল চায় বদল, বাসা – বদল !

[প্যাঁচারা ( Les Hiboux)
শার্ল বোদলেয়ার : তার কবিতা ; বিতৃষ্ণা ও আদর্শ ( Spleen et Ideal ) অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু ]

স্বচ্ছ বসনে ঢেউ তুলে – শার্ল বোদলেয়ার ; অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু

স্বচ্ছ বসনে ঢেউ তুলে চলে শ্রীমতী –
পদক্ষেপেই জাগে নৃত্যের ছন্দ,
যষ্টি প্রান্তে লতানো ময়াল যেমতি
তালে – তালে দুলে শোনে মায়াময় মন্ত্র ।
মানুষের সুখদু:খে নির্বিকার
যেমন মরুর ধূসর আস্তরন,
কিংবা ফেনিল সিন্ধু- তেমনি তার
উদাসীনতার হিমেই উন্মোচন ।
দীপ্ত ধাতুর ঝলকে মধুর নয়নে
রূপক – রঙ্গ খেলা করে অদ্ভুত,
মিল খুজে পায় স্ফিঙ্কস আর দেবদূত,
ইস্পাত, সোনা, হীরক, আলোর চয়নে
জ্বলে চিরকাল – নিস্ফল নক্ষত্র !–
বন্ধ্যা নারীর নিস্তাপ রাজছত্র ।

[ স্বচ্ছ বসনে ঢেউ তুলে ( Avce ses vetements ondoyants et nacres)
শার্ল বোদলেয়ার : তার কবিতা ; বিতৃষ্ণা ও আদর্শ ( Spleen et Ideal ) অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু ]

সুন্দর জাহাজ – শার্ল বোদলেয়ার ; অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু

অলস মায়াবিনী, বলবো তোরে, শোন,
অঙ্গে শোভে তোর কত না আভরণ ।
আকবো অপরূপ মাধুরী –
বালিকা – মহিলার মিলন মোহনার চাতুরী ।
যখন ফুলে ওঠে আচলে ঢেউ হাওয়ার অভিমান,
তখন মানি তোরে সুতিনু তরনির সাগর-অভিযান ।
তেমনি চঞ্চল, উত্তাল,
শিথিল, মন্থর ছন্দে হেলে-দুলে ছড়িয়ে দিলি পাল ।
দৃপ্ত গ্রীবা তোর, নধর স্কন্ধের আয়োজন
দেখায় মাথাটির কত যে অদ্ভুত বিকিরণ;
সৌম্য বিজয়ের নির্যাস
ছড়িয়ে, ওরে শিশু রাজ্ঞী ! তোর পথেহেলায় চলে যাস ।
অলস মায়াবিনী, বলবো তোরে,শোন,
অঙ্গে শোভে তোর কত না আভরণ ।
আকবো অপরুপ মাধুরী-
বালিকা-মহিলার মিলন-মোহনার চাতুরী ।
এগিয়ে আসে তোর নিটোল স্তনভার তুঙ্গ,উদ্দাম,
অনেক দ্বৈরথে বিজয়ী ওরা দুটি বর্ম অভিরাম-
যুগল ঢাল ধরে কত না
সুগোল, রেখায়িত আলোক-রশ্নির দ্যোতনা ।
উগ্র ঢাল, তার তীক্ষ শরমুখ রঙিন, কোপনীয়
রেখেছে সঞ্চিত যা-কিছু মায়াময়, মধুর,গোপনীয়-
আসব,সুরা, সৌগণ্ধ্য-
বুদ্ধি বানচাল, হৃদয়ে প্রলাপের ছন্দ ।
যখন ফুলে ওঠে আচলে ঢেউ তুলে হাওয়ার অভিমান,
তখন মানি তোরে সুতনু তরণীর সাগর-অভিযান ।
তেমনি চঞ্চল, উত্তাল,
শিথিল, মন্থর ছন্দে হেলে-দুলে ছড়িয়ে দিলি পাল ।
মহান জঙ্ঘার আঘাতে বসনের আলোড়ন
জাগায় যাতনায় আধার বাসনার আবেদন ।
যেন রে ডাকিনীরা দু-জনে
গভীর খলে নাড়ে কালিমা-ঘন এক পাচনে ।
প্রবল নায়কের বিরোধী খেলোয়াড় অকাতর,
ও-দুটি বাহু যেন কান্তিঝলকিত অজগর;
প্রেমিক বাধা পড়ে, ক্ষমাহীন
অতি কঠিন তোর, হৃদয়-কারাগারে,চিরদিন ।
দৃপ্ত গ্রীবা তোর, নধর স্কন্ধের আয়োজন
দেখায় মাথাটির কত যে অদ্ভুত বিকিরন;
সৌম্য বিজয়ের নির্যাস
ছড়িয়ে, ওরে শিশু-রাজ্ঞী ! তোর পথেহেলায় চলে যাস ।

[ সুন্দর জাহাজ ( Le Beau Navire)
শার্ল বোদলেয়ার : তার কবিতা ; বিতৃষ্ণা ও আদর্শ ( Spleen et Ideal ) অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু ]

সিথিরায় যাত্রা – শার্ল বোদলেয়ার ; অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু

উড্ডীন পাখির মতো, মুক্তছন্দে উৎফুল্ল উত্তাল,
দড়িদড়া ছিন্ন করে হৃদয় আমার ছুটেচলে,
দোলে নৌকা ক্ষণে- ক্ষণে রিক্তমেঘ আকাশের তলে,
যেন এক দেবদূত, রৌদ্রময় দিগন্তে মাতাল ।
দেখা যায় কোন দ্বীপ-কালো, আর বিষাদে মলিন ?
-জানো না, সিথেরা ঐ, সেকালের শৌখিন প্রিয়,
মামুলি এলদোরদো, গানে-গানে অবিস্মরনীয় ।
কিন্তু যাই বলো, এই দেশ বড় ধূসর, শ্রীহীন ।
-রহস্যে মধুর দ্বীপ,হৃদয়ের উজ্জলউৎসব !
তার তটরেখা থেকে, যেন এক গন্ধের উচ্ছ্বাস,
ভেসে আসে সনাতন ভেনাসের দৃপ্ত প্রতিভাস,
ব্যাপ্ত করে আত্মায় আলস্য আর প্রেমের বৈভব ।
সুন্দর, শ্যামল দ্বীপ পরিপূর্ন পুষ্পিত বিতানে,
চিরকাল সর্বজাতি যার কাছে অর্ঘ্য নিয়ে যায়,
হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস কেপে ওঠে তন্ময় পূজায়,
যেমন গন্ধের দোলা গোলাপের বিলোল বাগানে,
কিংবা যেন বনতলে কপোতের শাশ্বত কূজন !
কিন্তু তা তো নয় ! এ যে রুগ্ন এক বিশীর্ণ বিস্তার,
শিলাময় মরু, যাকে দীর্ণ করে কর্কশ চীৎকার ।
অথচ অদ্ভুত এক দৃশ্য দেখি ! নয় সেমোহন
ছায়াময় মরু কুঞ্জবনে পরিবৃত মন্দির, যেথায়
তন্বী এক পূজারিনী প্রেম দেয় ফুলের বিলাসে,
এবং গোপন তাপে দগ্ধতনু, ভ্রমে অনায়সে
অর্ধেক উন্মুক্ত করে বেশবাস চঞ্চল হাওয়ায় ;
যখন আসন্ন তীর, উপকুলে তরী প্রতিহত,
ধবল পালের পটে নাড়ে ডানা ব্যাকুলপাখিরা,
দেখি এক ফাসিকাষ্ঠ, কৃঞ্চকায়, সুদীর্ঘ, ত্রিশিরা,
আকাশেরে দীর্ণ করে উদাসীন সাইপ্রেসের মতো ।
ঝুলে আছে শব, তাতে শকুনেরা পঙক্তিভোজে বসে
হিংস্র বেগে ছিড়ে নেয় পক্ক মাংস, রক্তমেদে মাখা,
শটিত পুঞ্জের মধ্যে, যেন তীক্ষ্ন, কদর্য শলাকা,
হানে চঞ্চু অবিরাম, প্রত্যেকেই, নিষ্ঠুর আক্রোশে ;
চক্ষু দুই ছিদ্র তার, বিধ্বস্ত উদর থেকে খসে
পরিপুষ্ট অন্ত্রতন্ত্র ঊরুপ্রান্তে গড়ায় সচ্ছল,
এ- জঘন্য নিমন্ত্রণে পরিতৃপ্ত ঘাতকের দল
চঞ্চুর আঘাতে তাকে নপুংসক করেছে নি:শেষে ।
এদিকে, মঞ্চের তলে, ঊর্ধ্বমুখ, ক্ষুধায় উন্মাদ,
হিংসুক জন্তুর পাল শান্তিহীন ফেরে পাকে-পাকে,
সে-বিক্ষুব্ধ জনতার সবচেয়ে বড়ো যে, সেটাকে
মনে হয় অনুচরে পরিবৃত ভীষন জল্লাদ ।
সিথেরার পুত্র, যার জন্ম এই স্বচ্ছ নীলিমায়,
পুরাতন অনাচারে যুগান্তের সঞ্চিত দুর্নাম
এবং নিষিদ্ধ পাপ-তুমি তার দিয়ে গেলে দাম
মরণের পরপারে বাক্যহীন অবমাননায়।
অপহত হাস্যকর, তোর কষ্টে আমি যে তন্ময় !
জেনেছি, বিছিন্ন তোর প্রত্যঙ্গের দেখে নিপাতন-
আদন্তবিস্তৃত যেন ন্যক্কারের পুনরারোহণ –
অনাদি দু:খের ধারা, দীর্ঘায়িত, পিত্তবিষময় ।
স্মরণের বরণীয় রে পাতকী, তোর কাছে এসে
মনে জাগে অনেক চঞ্চুর বেগ, কঠিন চোয়াল –
যে-সব সুতীক্ষ্ণ শ্যেন, আর কালো শ্বাপদের পাল
একদা আমার মাংস চূর্ণ করেছিল ভালবেসে ।
মনোরোম নভোতর, নির্বিকার সিন্ধুর নীলিমা ;
কিন্তু সব অন্ধকার, রক্তমাখা আমার নয়নে,
হায় ! যেন ঢেকে দেয় কাফনের ঘন আচ্ছাদনে
আমার চিত্তেরে এই রূপকের নিবিড় কালিমা ।
ভেনাস, তোমার দ্বীপে শুধু এই প্রতীক প্রোথিত,
ফাসিকাষ্ঠে পচা মড়া- চিত্রকল্প ঝোলে সে আমারই ।
ভগবান, দাও সেই শক্তি ও সাহস, যাতে পারি
দেখে নিতে আমার শরীর – মন বিতৃষ্ণাব্যতীত ।

[ সিথিরায় যাত্রা (Un Voyage a Cythere)
শার্ল বোদলেয়ার : তার কবিতা;ক্লেদজ কুসুম (Les Fleurs du Mal) অনুবাদ : বুদ্ধদেব বসু ]