প্রথম প্রেমিকা -তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

লাইব্রেরি থেকে ফিরছি তখন মুঠোয় জীবনানন্দ,
বুঁদ হয়ে আছি পয়ারের ঝোঁকে নির্জন চারপাশ,
বিকেল বেলায় গোধূলির ছোঁয়া লেগে চারদিক রক্তিম,
ঠিক সে সময় চোখে পড়ে গেল উদাসীন সেই কিশোরী
দাঁড়িয়ে রয়েছে, মুঠোভরা তার কাঁঠালিচাঁপার পাপড়ি,
সে ছিল আমার প্রথম প্রেমিকা, সেদিনই প্রথম চোখাচোখি;
মেয়েটিকে যেন কোথায় দেখেছি, অথবাকোথাও দেখিনি,
ফর্সা কপালে ছড়িয়ে ছিল যে চূর্ণচুলের আঁকিবুঁকি
চোখদুটি যেন ভরাট সায়র দু-ভুরু বাঁকানো ধনুকে
বিস্ময় কিছু থম্ হয়ে আছে, চিবুকে লাল্চে রশ্মি,
ফ্রকের বাইরে গমরঙা বাহু নিটোল লতিয়ে রয়েছে
সে ছিল আমর প্রথম প্রেমিকা, সেদিনই প্রথম পরিচয়;
পরিচয় ক্রমে রঙ ধরে ওঠে, সে রঙ ক্রমেই গাঢ় হয়,
কলেজ ফেরার পথে দেখি রোজ দাঁড়িয়েরয়েছে একলা
কাঁঠালিচাঁপার পাপড়িও ঠিক রয়েছেদু-মুঠো ভর্তি
চুপিচুপি দিত কখন পকেটে, সারারাততার সুবাসে
ঘুম ছুটে যেত, চোখ বুজলেই তার মুখখানা টলোমলো,
সে ছিল আমার প্রথম প্রেমিকা, ভালবাসা সে-ই শেখাল;
তার ও শরীরে অক্ষরমালা, অক্ষর গেঁথে শব্দ,
শব্দে শব্দ গেঁথে গেঁথে তার শরীরে পংক্তি জেগেছে,
শব্দব্রহ্মে হীরকদ্যুতিটি আমাকেকাঁপালো অবিরাম,
কখনো পয়ারে হেসে কথা বলে, কখনো মাত্রাবৃত্তে
চলনে-বলনে নিপুণ ছন্দ, কখনো গদ্যে উদাসীন,
সে ছিল আমার প্রথম প্রেমিকা, প্রথম প্রেরণা সে-ই দেয়;
তার কাছে বাঁধা ছিল যে আমার কিশোরবেলার দিনগুলি,
ঠোঁটের দুকোণে মিষ্টি হাসিটি ঝড় তুলে যেত সহসা,
কখনো দুচোখে শ্রাবণ ঘনাত, কখনো মধুর ফাল্গুন
কাঁঠালিচাঁপায় মাখামাখি হয়ে এহেন কত না দিনক্ষণ
কেটে গেছে সুখে, আবেগ-উল্লাসে সেই সিরসির দিনগুলো,
সে ছিল আমার প্রথম প্রেমিকা, প্রথম স্পর্শ সে-ই দেয়;
দুচোখে নিবিড় চাউনিটি ছিল, দুটি সুখী সাদা পায়রা,
তার ও শরীর মন্থন কর এস্বর-ব্যঞ্জনবর্ণ,
সাদা পায়রার ডানাটি আমাকে টেনে নিয়ে গেল কদ্দূর
ক্রমশ যাচ্ছি লোকালয় ফেলে, পাহাড়, সাগর ডিঙিয়ে
সে এক নতুন অনুভূতি এল, সে এক নতুন বিশ্ব,
সে ছিল আমার প্রথম প্রেমিকা, অন্য জন্ম সে-ই দেয়;
তার বাবা হল বদলি হঠাত্, মালদা কিংবা হুগলি,
সে-ও চলে গেল, কাঁঠালিচাঁপাকে করেছি দুহাতে টুকরো,
দু’চোখে উথালপাথাল অশ্রু, বৈশাখীএল ঝড় হয়ে
আলুথালু করে দিয়ে গেল সেই দ্বিধাথরোথরো কৈশোর
সেই শেষ দেখা, তারপরে কত দীর্ঘশ্বাস ফেলেছি,
সে ছিল আমার প্রথম প্রেমিকা, প্রথম দূ:খ সে-ই দেয়;
চলে যাওয়া তার যাওয়া নয় যেন, সে এল আবার ফিরিয়া
ঘুমে জাগরণে কুরে কুরে খায়, পোড়ায়, ডোবায় প্লাবনে,
ধ্বংস করেছে পুরনো আমাকে, ধ্বংসের পর সৃষ্টি,
ফিনিক্স পাখিটি জেগে ওঠে, দেখে সামনে পৃথিবী উর্বর,
কেউ যেন তাকে উস্কে যাচ্ছে অন্তরীক্ষে ইশারায়,
সে ছিল আমার প্রথম প্রেমিকা, প্রথম কবিতা সে-ই দেয়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s