বাঙালি রক্তের মত লাল-1 -মোহাম্মদ কামাল

কুড়ালের ছায়া দুলে উঠে যদি বলে যায়
আর ফাল্গুনে পলাশ না ফোটে,
শিমুল নাফোটে, না ফোটে ডালিম
উস্কানির আলো কোন লাল ফুল!
দীর্ঘদেহী কুড়ালের
ছায়া দুলে ওঠে বাঙলায়..
ইতিহাস আছে, কোন
কুড়াল শাসন ভীত ইতিহাস?
বাঙালি রক্তের মত লাল
ফুল ফুটবেই
অনন্ত ফাল্গুন.

বাঙালি রক্তের মত লাল-2 -মোহাম্মদ কামাল

রক্তের আলকাতরা অন্ধকারে বধ্যরাত্রি
দালি’র চোয়ানো ঘড়ির মত
মহাকালে জমাট
ধ্বংস চমকে উজ্জ্বলন্ত পলকের লোমহর্ষ
লাল!
গলনাঙ্কে হিমালয় এত
ফিনকি ধারা কখনো দ্যাখেনি
কখনো দ্যাখেনি এত জল বঙ্গোপসাগর
কখনো মাখেনি কোন মুক্তিযুদ্ধ এত
সংশপ্তকের হৃৎপিণ্ডের লাভা৤
লক্ষপ্রাণের ঘনীভূত একছোপ
চোয়ানো রক্তের মত
মহাকালের প্রকাশ্য দিবালোকে জমাট
বাংলাদেশের মানচিত্র
অনন্তে একছোপ চোয়ানো রক্তের মত
মহাকালে জমাট৤
অগ্নিচেতনার লাল
নিজস্ব তাজা ক্ষতের মত লাল
স্বাধীনতা বাঙালি রক্তের মত লাল৤

শাহবাগ নেই শুধু শাহবাগ মোড়ে-মুহম্মদ নূরুল হুদা

চলো ভাই চলো বোন চলো শাহবাগ
মহানগরীর মুখ চলো শাহবাগ
মহাজনতার মুখ চলো শাহবাগ
প্রজন্মের জয়ী মুখ চলো শাহবাগ
পিজি আর জাদুঘর পাশে শাহবাগ
নজরুল জয়নুল পাশে শাহবাগ
জনকের বজ্রধ্বনি পাশে শাহবাগ
সার্বভৌম হে তর্জনী পাশে শাহবাগ
শাহবাগ নেই শুধু শাহবাগ মোড়ে
শাহবাগ নেই শুধু ঢাকার শহরে
শাহবাগ নেই শুধু নগর-বাংলায়
যেখানে বাঙালি যায়, শাহবাগ যায়
অলিগলি তেপান্তর আজ শাহবাগ
পাখপাখালির ডানা আজ শাহবাগ
মেঠোপথ বালুচর আজ শাহবাগ
বাঙালির পথচিহ্ন আজ শাহবাগ
রবীন্দ্রনাথের বাংলা আজ শাহবাগ
নজরুলের জয় বাংলা আজ শাহবাগ
মুজিবের জয় বাংলা আজ শাহবাগ
জনতার জয় বাংলা আজ শাহবাগ
চলো ভাই চলো বোন চলো শাহবাগ
এ বাংলার জলস্থল চলো শাহবাগ
এ বাংলার নভোতল চলো শাহবাগ
এ বাংলার প্রতি ইঞ্চি চলো শাহবাগ
খুনির বিচার আছে আছে শাহবাগ
জনতার রায় আছে আছে শাহবাগ
ফাঁসির মঞ্চ আছে আছে শাহবাগ
রাজা নেই রাণী নেই আছে শাহবাগ
চলো ভাই চলো বোন চলো শাহবাগ
হাতে হাত কাঁধে কাঁধ চলো শাহবাগ
শ্লোগানে ও গানে গানে চলো শাহবাগ
গণতন্ত্র জপমন্ত্র চলো শাহবাগ
আরেকবার বাহান্ন চলো শাহবাগ
আরেকবার একাত্তর চলো শাহবাগ
আরেকবার পুণ্যবাংলা চলো শাহবাগ
আরেকবার সাম্যবাদ চলো শাহবাগ
সকালে সূর্য জ্বলে চলো শাহবাগ
দুপুরে শৌর্য জ্বলে চলো শাহবাগ
বিকেলে জনতা জ্বলে চলো শাহবাগ
দিনে আলো রাতে আলো আলো শাহবাগ

কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি- মাহবুবুল আলম চৌধুরী

ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশি
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে—রমনার
রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়
ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য—বাংলার জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
একটি দেশের মহান সংস্কৃতির মর্যাদার
জন্য
আলাওলের ঐতিহ্য
কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের
সাহিত্য ও কবিতার জন্য
যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে
পলাশপুরের মকবুল আহমদের
পুঁথির জন্য
রমেশ শীলের গাথার জন্য,
জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’
জন্য।
যারা প্রাণ দিয়েছে
ভাটিয়ালি, বাউল, কীর্তন, গজল
নজরুলের “খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি
আমার দেশের মাটি।”
এ দুটি লাইনের জন্য
দেশের মাটির জন্য,
রমনার মাঠের সেই মাটিতে
কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো
চল্লিশটি তাজা প্রাণ আর
অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য
বুকের রক্ত।
রামেশ্বর, আবদুস সালামের কচি বুকের রক্ত
বিশ্ববিদ্যালয়ের
সবচেয়ে সেরা কোনো ছেলের বুকের
রক্ত।
আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের
প্রতিটি রক্তকণা
রমনার সবুজ ঘাসের উপর
আগুনের মতো জ্বলছে, জ্বলছে আর
জ্বলছে।
এক একটি হীরের টুকরোর মতো
বিশ্ববিদ্যালয়ের
সেরা ছেলে চল্লিশটি রত্ন
বেঁচে থাকলে যারা হতো
পাকিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ
যাদের মধ্যে লিংকন, রকফেলার,
আরাগঁ, আইনস্টাইন আশ্রয় পেয়েছিল
যাদের মধ্যে আশ্রয় পেয়েছিল
শতাব্দীর সভ্যতার
সবচেয়ে প্রগতিশীল কয়েকটি মতবাদ,
সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ
দিয়েছে
আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি।
যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল
ওখানে
যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার
আদেশ নিয়ে
আমরা তাদের কাছে
ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও
আসিনি আজ।
আমরা এসেছি খুনি জালিমের ফাঁসির
দাবি নিয়ে।
আমরা জানি ওদের হত্যা করা হয়েছে
নির্দয়ভাবে ওদের গুলি করা হয়েছে
ওদের কারো নাম তোমারই মতো ওসমান
কারো বাবা তোমারই বাবার মতো
হয়তো কেরানি, কিংবা পূর্ব বাংলার
নিভৃত কোনো গাঁয়ে কারো বাবা
মাটির বুক থেকে সোনা ফলায়
হয়তো কারো বাবা কোনো
সরকারি চাকুরে।
তোমারই আমারই মতো
যারা হয়তো আজকেও বেঁচে থাকতে
পারতো,
আমারই মতো তাদের কোনো একজনের
হয়তো বিয়ের দিনটি পর্যন্ত ধার্য
হয়ে গিয়েছিল,
তোমারই মতো তাদের কোনো একজন
হয়তো
মায়ের সদ্যপ্রাপ্ত চিঠিখানা এসে পড়বার
আশায়
টেবিলে রেখে মিছিলে যোগ
দিতে গিয়েছিল।
এমন এক একটি মূর্তিমান
স্বপ্নকে বুকে চেপে
জালিমের গুলিতে যারা প্রাণ দিল
সেই সব মৃতদের নামে
আমি ফাঁসি দাবি করছি।
যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন
দিতে চেয়েছে তাদের জন্যে
আমি ফাঁসি দাবি করছি
যাদের আদেশে এই
দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্যে
ফাঁসি দাবি করছি
যারা এই মৃতদেহের উপর দিয়ে
ক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছে
সেই বিশ্বাসঘাতকদের জন্যে।
আমি তাদের বিচার দেখতে চাই।
খোলা ময়দানে সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে
শাস্তিপ্রাপ্তদের গুলিবিদ্ধ অবস্থায়
আমার দেশের মানুষ দেখতে চায়।
পাকিস্তানের প্রথম শহীদ
এই চল্লিশটি রত্ন,
দেশের চল্লিশ জন সেরা ছেলে
মা, বাবা, নতুন বৌ, আর
ছেলে মেয়ে নিয়ে
এই পৃথিবীর কোলে এক একটি
সংসার গড়ে তোলা যাদের
স্বপ্ন ছিল
যাদের স্বপ্ন ছিল আইনস্টাইনের
বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে
আরো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার,
যাদের স্বপ্ন ছিল আণবিক শক্তিকে
কী ভাবে মানুষের কাজে লাগানো যায়
তার সাধনা করার,
যাদের স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রনাথের
‘বাঁশিওয়ালার’ চেয়েও সুন্দর
একটি কবিতা রচনা করার,
সেই সব শহীদ ভাইয়েরা আমার
যেখানে তোমরা প্রাণ দিয়েছ
সেখানে হাজার বছর পরেও
সেই মাটি থেকে তোমাদের রক্তাক্ত
চিহ্ন
মুছে দিতে পারবে না সভ্যতার
কোনো পদক্ষেপ।
যদিও অগণন অস্পষ্ট স্বর নিস্তব্ধতাকে ভঙ্গ
করবে
তবুও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘণ্টা ধ্বনি
প্রতিদিন তোমাদের ঐতিহাসিক মৃত্যুক্ষণ
ঘোষণা করবে।
যদিও ঝঞ্ঝা-বৃষ্টিপাতে—বিশ্ববিদ্যালয়ের
ভিত্তি পর্যন্ত নাড়িয়ে দিতে পারে
তবু তোমাদের শহীদ নামের ঔজ্জ্বল্য
কিছুতেই মুছে যাবে না।
খুনি জালিমের নিপীড়নকারী কঠিন হাত
কোনো দিনও চেপে দিতে পারবে না
তোমাদের সেই লক্ষদিনের আশাকে,
যেদিন আমরা লড়াই করে জিতে নেব
ন্যায়-নীতির দিন
হে আমার মৃত ভাইরা,
সেই দিন নিস্তব্ধতার মধ্য থেকে
তোমাদের কণ্ঠস্বর
স্বাধীনতার বলিষ্ঠ চিৎকারে
ভেসে আসবে
সেই দিন আমার দেশের জনতা
খুনি জালিমকে ফাঁসির কাষ্ঠে
ঝুলাবেই ঝুলাবে
তোমাদের আশা অগ্নিশিখার
মতো জ্বলবে
প্রতিশোধ এবং বিজয়ের আনন্দে।

একুশের কবিতা – মহাদেবসাহা

ভিতরমহলে খুব চুনকাম, কৃষ্ণচূড়া
এই তো ফোটার আয়োজন
বাড়িঘর কী রকম যেন তাকে হলুদ
অভ্যাসবশে চিনি,
হাওয়া একে তোলপাড় করে বলে, একুশের
ঋতু!
ধীরে ধীরে সন্ধ্যার সময় সমস্ত রঙ
মনে পড়ে, সূর্যাস্তের
লীন সরলতা
হঠাৎ আমারই জামা সূর্যাস্তের
রঙে ছেয়ে যায়,
আর আমার অজ্ঞাতে কারা আর্তনাদ
করে ওঠে রক্তাক্ত রক্তিম
বলে তাকে!
আমি পুনরায় আকাশখানিরে চেয়ে দেখি
নক্ষত্রপুঞ্জের মৌনমেলা,
মনে হয় এঁকেবেঁকে উঠে যাবে আমাদের
ছিন্নভিন্ন পরাস্ত জীবন,
অবশেষে বহুদূরে দিগন্তের দিকচিহ্ন
মুছে দিয়ে
ডাক দেবে আমরাই জয়ী!

তোমাকে অভিবাদনপ্রিয়তমা – শহীদ কাদরী

ভয় নেই
আমি এমন
ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী
গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে
মার্চপাস্ট করে চলে যাবে
এবং স্যালুট করবে
কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে
কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক
রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে
আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে
ভায়োলিন বোঝাই করে
কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা।
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো-
বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো
মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো
প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে
কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা।
ভয় নেই…আমি এমন ব্যবস্থা করবো
একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের
সবগুলো রণতরী
এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর
সঙ্গে প্রতিযোগিতায়
সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক,
প্রিয়তমা!
সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো, শেষ
হবে যাবে-
আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক
অনায়াসে বিরোধীদলের অধিনায়ক
হয়ে যাবেন
সীমান্তের ট্রেঞ্চগুলোয়
পাহারা দেবে সারাটা বৎসর
লাল নীল সোনালি মাছি-
ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু
নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, প্রিয়তমা।
ভয় নেই আমি এমন
ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে
শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন
আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে
গণচুম্বনের ভয়ে
হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি,
প্রিয়তমা।
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
শীতের পার্কের ওপর বসন্তের সংগোপন
আক্রমণের মতো
অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে-
বাজাতে বিপ্লবীরা দাঁড়াবে শহরে,
ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো
স্টেটব্যাংকে গিয়ে
গোলাপ
কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার
লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে
একটি বেলফুল দিলে চারটি কার্ডিগান।
ভয় নেই, ভয় নেই
ভয় নেই,
আমি এমন ব্যবস্থা করবো
নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী
কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে-
ঘিরে
নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা।

শ্যামল চন্দ্র দাসেরপংতিমালা : এক সাথে সববাংলা অক্ষর ও যুক্তাক্ষরঅনুশীলন

হৃদয়ের চঞ্চলতা বন্ধে ব্রতী হলে
জীবন পরিপূর্ণ হবে নানা রঙের ফুলে।
কুঞ্ঝটিকা প্রভঞ্জন শঙ্কার কারণ
লণ্ডভণ্ড করে যায় ধরার অঙ্গন।
ক্ষিপ্ত হলে সাঙ্গ হবে বিজ্ঞজনে বলে
শান্ত হলে এ ব্রহ্মাণ্ডে বাঞ্ছিতফল
মেলে।
আষাঢ়ে ঈশান কোনে হঠাৎ ঝড় উঠে
গগন মেঘেতে ঢাকে বৃষ্টি নামে মাঠে
ঊষার আকাশে নামে সন্ধ্যার ছায়া

দেখো থেমে গেছে পারাপারে খেয়া।
শরৎ ঋতুতে চাঁদ আলোয় অংশুমান
সুখ দুঃখ পাশা পাশি সহ অবস্থান।
যে জলেতে ঈশ্বর তৃষ্ণা মেটায়
সেই জলেতে জীবকুলে বিনাশ ঘটায়।
রোগ যদি দেহ ছেড়ে মনে গিয়ে ধরে
ঔষধের সাধ্য কি বা তারে সুস্থ করে ?
(পংতিমালা গুলো জনাব শ্যামল চন্দ্র
দাসের লেখা)